ৎসোফ্রেনিয়

এই পুস্তিকাটির বিষয়ে

যাঁর নিজের ঘুমের অসুবিধা হয়, বা তিনি যাঁর সঙ্গে থাকেন তাঁর ঘুমের অসুবিধা হয়, তিনি এই পুস্তিকা ব্যবহার করতে পারেন। এতে ঘুম সংক্রান্ত নানা তথ্য দেওয়া আছে। ঘুমের কিছু সমস্যা প্রায়শই দেখা যায় এবং কিছু সমস্যা অপেক্ষাকৃত কম দেখা যায়। দুধরনের অসুবিধার কথাই এখানে সবিস্তারে লেখা আছে। ভালো ঘুমানোর কিছু সহজ টিপস এবং কখন ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে তাও এতে জানানো হয়েছে।


সূচনা

সাধারণত ঘুম নিয়ে আমাদের বেশি ভাবতে হয় না। এটাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অঙ্গ বলেই আমরা মনে করি। ঘুম না এলে অবশ্য সমস্যা হয়। আসলে আমাদের সকলেরই কোনো না কোনো সময়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। একে বলে অনিদ্রা। কখনো কখনো অল্প কদিন অনিদ্রা হয় যদি আমরা চিন্তিত বা উত্তেজিত থাকি। কয়েকদিন বাদে এটা কেটে গেলে আমরা আবার স্বাভাবিক ভাবে ঘুমোতে পারি। আমাদের শরীর এবং মন সুস্থ রাখতে ঘুমের প্রয়োজন। বেশিদিন ঠিকমত ঘুম না হলে আমরা তার ফল বুঝতে পারি।


ঘুম কী?

দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ঘুম হচ্ছে সেই সময় যখন আমরা আমাদের চারপাশ সম্বন্ধে অবহিত থাকি না। প্রধানত দুধরনের ঘুম হয়ঃ

  • রেম

সারা রাতের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আমাদের এই ঘুমে কাটে। রেম ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক সজাগ থাকে, আমাদের মাংসপেশি শিথিল থাকে, আমাদের চোখ এদিক থেকে ওদিকে ঘুরতে থাকে এবং আমরা স্বপ্ন দেখি।

  • নন রেম

এই ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে শরীর নড়াচড়া করতে পারে। এই সময় হরমোন নি:সৃত হয় এবং দিনের ক্লান্তি দূর হয়ে শরীর আবার সতেজ হয়ে ওঠে। নন রেম ঘুমের চারটি স্তর আছে।

১। ঘুমের আগের স্টেজ - মাংসপেশি শিথিল হয়, হৃদস্পন্দন কমে আসে, শরীরের তাপমাত্রা কমে। 
২। হাল্কা ঘুম - এই স্টেজে সহজেই ঘুম ভেঙ্গে যায়, চারপাশ সম্বন্ধে স্বাভাবিক সচেতনতা থাকে। 
৩। ‘স্লো ওয়েভ ঘুম’ – ব্লাড প্রেসার কমে, এই স্টেজে লোকে ঘুমের ঘোরে হাটে বা কথা বলে। 
৪। গাঢ় ‘স্লো ওয়েভ ঘুম’ – ঘুম সহজে ভাঙতে চায় না। ভেঙ্গে গেলে চারপাশ সম্বন্ধে স্বাভাবিক সচেতনতা থাকে না।

আমরা রাতে রেম এবং ননরেম ঘুমের মধ্যে থাকি, অন্তত পাঁচবার এই স্টেজগুলি ঘুরে ঘুরে আসে। সকালের দিকে আমরা বেশি স্বপ্ন দেখি।

রাতে আমাদের ঘন্টা দুয়েক বাদে বাদে মিনিট খানেকের জন্য ঘুম ভাঙতে পারে। এটা আমাদের সবসময় মনে থাকে না। এগুলি আমাদের মনে থাকে যদি আমরা চিন্তায় থাকি, কিংবা অন্য কোনো অসুবিধা হয় (যেমন অন্য কেউ যদি নাক ডাকায় বা বাইরে যদি কোনো আওয়াজ হয় ইত্যাদি)।


কতটা ঘুম আমাদের দরকার?

এটা প্রধানত আমাদের বয়সের উপর নির্ভর করে। 

  •  ছোট শিশু দিনে সতের ঘন্টা ঘুমোয়। 
  •  একটু বড় হলে তারা রাতে আট ন ঘন্টা ঘুমোয়।
  •  প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারনতঃ সাত আট ঘন্টা ঘুম লাগে।
  •  বেশি বয়স হলে একই রকম ঘুম দরকার হয়। তবে তাদের রাতে সাধারনতঃ একবার ভালো ঘুম হয়, প্রথম রাতে ঘন্টা তিন চারের জন্য। তারপর তাদের ঘুম সহজে ভেঙ্গে যায়।বেশি বয়সে লোকে স্বপ্ন কম দেখে।

একই বয়সের লোকের মধ্যেও ঘুমের তারতম্য হয়। বেশির ভাগ মানুষের সাত বা আট ঘন্টা ঘুমোন। অল্পসংখ্যক কিছু মানুষের শুধুমাত্র তিন ঘন্টা ঘুমই যথেষ্ট। নিয়মিত সাত আট ঘন্টার বেশি রাতে ঘুমানো ভালো নয়।
ঘুমের মধ্যে অল্প যে সময় আমরা জেগে থাকি সেই সময়টাকে অনেকটা দীর্ঘ মনে হয়। কাজেই আমাদের মনে হয় যে আমাদের যথেষ্ট ঘুম হয় নি।


ঘুম না হলে কী হবে?

ঘুম না হলে দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। এক আধ রাত না ঘুমোলে পরদিন ক্লান্ত লাগবে, কিন্তু এতে আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হবে না।
কিন্তু বেশ কয়েক রাত ঘুম না হলে, আপনি দেখবেনঃ

  •  সবসময় ক্লান্ত লাগছে
  •  দিনের বেলা চোখ ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছে
  •  মনঃসংযোগ করতে অসুবিধা হচ্ছে
  •  সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হচ্ছে
  •  মন খারাপ লাগছে

গাড়ী চালালে বা মেশিন চালালে এতে অসুবিধা হতে পারে। প্রতি বছর বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটে মানুষ গাড়ী চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়বার ফলে।

ঘুমের অভাবের দরুন আমাদের ব্লাড প্রেসার বাড়া, ওজন বাড়া এবং ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

প্রাপ্তবয়স্কদের ঘুমের অসুবিধা

কম ঘুম হওয়া (অনিদ্রা)

হয় আপনার ঘুম কম হচ্ছে অথবা যথেষ্ট ঘুম হলেও ঘুমের পর শরীরটা ঝরঝরে লাগছে না।
ঘুম না হবার অনেক কারণ আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।

  •  শোবার ঘরে বেশি শব্দ বা সেখানে বেশি গরম কিংবা বেশি ঠান্ডা
  •  বিছানা বেশি ছোট বা যথেষ্ট আরামদায়ক নয়
  •  আপনার এবং আপনার স্বামী বা স্ত্রীর ঘুমের প্যাটার্ন এক রকম না
  •  আপনার হয়ত নির্দিষ্ট কোনো রুটিন নেই অথবা আপনি যথেষ্ট শারীরিক পরিশ্রম করেন না
  •  বেশি খেলে ঘুমোতে অসুবিধা হতে পারে
  •  পেটে খিদে থাকলে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে
  •  সিগারেট, মদ বা ক্যাফিনযুক্ত কোনো পানীয় যথা চা বা কফি
  •  অসুখ, ব্যথা বা জ্বর

আর কিছু সিরিয়াস কারণ হলঃ

  •  মানসিক অশান্তি
  •  কর্মক্ষেত্রে অসুবিধা
  •  দুশ্চিন্তা
  •  বিষাদ – সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এবং আর ঘুম না হতে পারে
  •  দৈনন্দিন ব্যাপারে সবসময় চিন্তা করা

ওষুধে কি লাভ হয়?

বহু বছর ধরে মানুষ ঘুমের ওষুধ ব্যবহার করে আসছে, কিন্তু এখন আমরা জানি যে এগুলিঃ

  •  বেশিদিন কাজ করে না
  •  পরদিন আপনি ক্লান্ত ও খিটখিটে থাকেন
  •  তাড়াতাড়ি এদের কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়, আপনাকে ওষুধের পরিমাণ বাড়াতে হবে সেই একই কাজ হবার জন্য।
  •  এতে অভ্যাস হয়ে যায়। বেশিদিন ব্যবহার করলে ঘুমের ওষুধের ঊপর আপনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন।
  •  নতুন কিছু ঘুমের ওষুধ পাওয়া যায় (যথা Zolpidem, Zalpelon বা Zopiclone), কিন্তু সেগুলিরও পুরানো ওষুধের মতই (যথা Nitrazepam, Temazepam and Diazepam) পাশ্বর্প্রতিক্রিয়া হয়।

ঘুমের ওষুধ অল্প কিছুদিনের জন্য খাওয়া চলে – এই সপ্তাহ দুয়েকের জন্য। ধরুন আপনি এতটাই মনোকষ্টে আছেন যে একেবারেই ঘুমোতে পারছেন না, তখন নিশ্চয় ঘুমের ওষুধ খাওয়া দরকার।
এমন যদি হয় যে আপনি দীর্ঘকাল ধরে ঘুমের ওষুধ খাচ্ছেন, তাহলে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে আস্তে আস্তে সেটা কমানো দরকার।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষাদপ্রতিরোধক বড়ি সেবন করা দরকার।


ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধ

অনেক ওষুধ ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপসান ছাড়াই পাওয়া যায় কেমিষ্টের দোকান থেকে। এতে অনেক সময় অ্যান্টিহিস্টামিন থাকে। অ্যান্টিহিস্টামিন সর্দি, কাশি হে ফিভার এই ধরনের ওষুধেও থাকে।এতে কাজ হয়, কিন্তু পরদিন সকালে অনেকক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব থাকে।এসব ব্যবহার করলে পরদিন গাড়ী বা মেশিন চালাবেন না। আরেকটা অসুবিধা হল অভ্যাস হয়ে যাওয়া। যতই শরীর অভ্যস্ত হয়ে যায়, ততই আপনাকে ডোজ বাড়াতে হয়, আগের মত কাজ পাবার জন্য। এই জাতীয় ওষুধ বেশিদিন না খাওয়াই ভাল।

হাবার্ল ওষুধগুলি প্রধানত Valerian নামে একটি উদ্ভিদ থেকে তৈরী।এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে যদি এটি দুতিন সপ্তাহ বা তার চেয়ে কিছু বেশিদিন রোজ রাতে ব্যবহার করা হয়। মাঝে মধ্যে নিলে বিশেষ লাভ হয় না। অ্যান্টিহিস্টামিনের মত এটি ব্যবহার করলেও পরদিন সকালে এর এফেক্ট থাকে।যদি আপনি ব্লাড প্রেসারের ওষুধ বা অন্য কোনো ঘুমের ওষুধ ব্যবহার করেন, তবে ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধ ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।


সাইকোলজিকাল চিকিৎসা

কগ্নিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি বলে একধরনের চিকিৎসা অনিদ্রাতে কাজ করে বলে প্রমানিত হয়েছে।এতে যে চিন্তা আপনাকে বেশি ভাবিয়ে তুলছে এবং আপনার ঘুমের ব্যাঘাত করছে তার মোকাবিলা করতে শেখায়।

 

এগুলি এড়িয়ে চলুনঃ

  • মদ- সবাই জানে যে মদ খেলে ঘুম আসে। কিন্তু মুশকিল হল যে মাঝরাতে আপনার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। আপনি নিয়মিত যদি ঘুমের জন্য মদ খান, তবে দেখবেন যে ক্রমে ক্রমে আপনি মদের পরিমাণ  বাড়াচ্ছেন একই এফেক্ট পাওয়ার জন্য। আপনি যদি নিয়মিত মদ খান এবং হঠাৎ করে মদ খাওয়া বন্ধ করেন, তবে দুতিন সপ্তাহ আপনার ঘুম আসবে না।
  • রোগা হবার ওষুধ বা যে কোনো ড্রাগ (যথা কোকেন, অ্যাম্ফেটামিন বা এক্সটাসি) ঘুমের ব্যাঘাত করে।

নিজে কী করা যায়ঃ

এখানে কিছু সহজ টিপস দেওয়া হল যাতে অনেক লোকের উপকার হয়েছে।
কী করবেন

  •  আপনার বিছানা আর শোবার ঘর যেন আরামদায়ক হয়। বেশি গরম বা বেশি ঠান্ডা যেন না হয় এবং সেখানে যেন বেশি আওয়াজ না হয়।
  •  আপনার বিছানায় যেন আপনি ঠিকভাবে শুতে পারেন। বেশি শক্ত হলে আপনার কোমর বা কাঁধে ব্যথা হবে, আর বেশি নরম হলে শরীর যথেষ্ট সাপোর্ট পাবে না। দশ বছর বাদে বাদে তোষক পাল্টানো দরকার।
  •  এক্সারসাইজ করুন। বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না, কিন্তু নিয়মিত হাঁটতে বা সাঁতার কাটতে চেষ্টা করুন। এক্সারসাইজ করার সবচেয়ে ভাল সময় দিনের বেলা। আপনি চাইলে মধ্য দুপুরে বা সন্ধ্যার পর এক্সারসাইজ করতে পারেন। এর পরে করলে ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে। 
  •  বিছানায় শোবার আগে রিল্যাক্স করুন। কেউ কেউ অ্যারোমাথেরাপি ব্যবহার করেন।
  •  যদি কোনো চিন্তা আপনার মাথায় ঘোরে এবং সে ব্যাপারে তখনি কিছু করা সম্ভব না, তাহলে সেটা লিখে রাখুন। শোবার আগে নিজেকে বলুন যে কাল আমি এই সমস্যা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করব।
  •  যদি ঘুম না আসে, উঠে রিলাক্সিং কোনো কাজ করুন। বই পড়ুন, টিভি দেখুন অথবা হাল্কা গান চালান। খানিকক্ষণ বাদে আপনার ঘুম ঘুম লাগলে বিছানায় শুতে যান।

কী করবেন না

  •  বেশিদিন না ঘুমিয়ে কাটাবেন না। রাতে ক্লান্ত বোধ করলে তবেই শুতে যাবেন, কিন্তু সকালে একই সময়ে উঠবেন, আপনি ক্লান্ত বোধ করুন আর নাই করুন।
  •  চা বা কফি পান করার পর শরীরে অনেকক্ষণ ক্যাফিনের প্রভাব থাকে। দুপুরের পর আর চা বা কফি খাবেন না। সন্ধ্যাবেলা আপনি গরম কোনো পানীয় খেতে চাইলে, হয় দুধ বা অন্য কোনো ক্যাফিনমুক্ত পানীয় পান করুন।
  •  বেশি মদ খাবেন না। প্রাথমিক ভাবে ঘুম এলেও, প্রায় অবধারিতভাবে আপনার মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
  •  বেশি রাতে ভারী খাবার খাবেন না। নৈশভোজ সন্ধ্যার দিকে সারতে পারলেই ভালো।
  •  আপনার রাতে ঘুম না হলে,পরদিন দিনের বেলা ঘুমোবেন না। তাহলে ফের সেদিন রাতে ঘুম আসতে অসুবিধা হবে।

এই পন্থায় চলে, তাও যদি আপনার ঘুম না আসে, আপনার ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আপনার কী চিন্তা মাথায় ঘুরছে, রাতে ঘুম আসছে না সে বিষয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার ডাক্তার বুঝতে পারবেন আপনার অনিদ্রার কারণ কী- শারীরিক অসুখ, মানসিক অশান্তি নাকি কোন ওষুধ যা আপনি খাচ্ছেন?অনিদ্রা দীর্ঘস্থায়ী হলে, কগ্নিটিভ বিহেভিয়র থেরাপির সাহায্যে আপনি উপকার পেতে পারেন।


ঘুমের সময় পরিবর্তন - সিফটে কাজ করা বা সন্তানের জন্ম

রাতে যখন ঘুমোনোর সময়ে তখন হয়ত কাজের জন্য আপনাকে জেগে থাকতে হয়। এটা যদি আপনাকে মাঝে সাঝে করতে হয়, তবে তাতে সহজেই অভ্যস্ত হয়ে জাবেন আপনি। কিন্তু প্রায়ই ঘুমের সময় পরিবর্তন হলে, অভ্যস্ত হওয়া অনেক বেশি কঠিন। সিফটে যাঁরা কাজ করেন, ডাক্তার বা নার্স যাঁরা রাতে ডিউটি করেন বা যে মা সন্তানকে দুধ খাওয়ান, সবাইকেই এই অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। সকলের যখন ঘুমের সময় তখন তাঁরা জেগে থাকেন। জেট ল্যাগ হলেও একই অসুবিধা হয়। সময় দ্রুত পাল্টে যাবার ফলে আপনি দেখবেন যে সবাই যখন ঘুমোচ্ছেন তখন আপনি জেগে আছেন।
সহজে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে হলে রোজ সকালে একই সময়ে উঠে পড়ুন আগের রাতে আপনি যত রাতেই ঘুমোন না কেন। এলার্ম ঘড়ি ব্যবহার করুন। সেদিন রাত না হলে কিছুতেই শুতে যাবেন না।কয়েক রাত এরকম করলে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যাবেন আপনি।


বেশি ঘুম

হয়ত আপনি দিনে বার বার ঘুমিয়ে পড়েন। রাতে ঠিকমত ঘুম না হলে প্রায়ই এটি হয়। যদি দুতিন সপ্তাহ রাতে যথেষ্ট ঘুম হওয়া সত্ত্বেও আপনার দিনে বেশি ঘুম পায়, তাহলে হয়ত অন্য কোনো কারণ আছে যথা ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা ভাইরাল ইনফেক্সন।

আরো কিছু কারণে মানুষ বেশি ঘুমোয়।


নারকোলেপ্সি

এটি সচরাচর ঘটে না, এবং অনেক সময় ডাক্তাররা এই রোগ নির্ণয় করতে পারেন না।
এর দুটি প্রধান উপসর্গ হলঃ

  •  দিনের বেলায় ঘুম পায় এবং হঠাৎ হঠাৎ সাংঘাতিক ঘুম পেয়ে যায় (এমনকি আপনি অন্য লোকের সঙ্গে থাকলেও)
  •  আপনি হঠাৎ হাসলে, রাগলে বা উত্তেজিত হলে আপনার মাংসপেশির উপর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এবং আপনি পড়ে যান। একে বলে ক্যাটাপ্লেক্সি।

আপনি হয়ত দেখবেন যে তাছাড়াও আরো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে যেমনঃ

  •  ঘুমিয়ে পড়ার আগে বা ঘুম থেকে উঠে আপনি কথা বলতে বা নড়াচড়া করতে পারছেন না (স্লিপ প্যারালিসিস)
  •  স্বপ্নের মত ছবি বা উল্টোপাল্টা কথাবার্তা শুনছেন (হ্যালুসিনেশান)
  •  রাতে ঘুমের ঘোরে এমন কিছু কাজ করেছেন যা আপনার মনে নেই
  •  রাতে হঠাৎ গরম লেগে ঘুম ভেঙ্গে গেছে

কিছুদিন আগে এই অসুখের কারণ জানা গিয়েছে ওরেক্সিন (orexin)বা হাইপোক্রেটীন (hypocretin)এর অভাব।
নিয়মিত এক্সারসাইজ করবেন এবং রাতে সময়মাফিক শুয়ে পড়বেন। লক্ষণ বুঝে ওষুধ লাগতে পারে, বিষাদপ্রতিরোধক বড়ি বা যে ওষুধে ঘুম ঘুম ভাব কাটে, যথা মোডাফানিল (Modafinil)।

স্লিপ অ্যাপ্নিয়া

  •  আপনি রাতে নাক ডাকিয়ে ঘুমোন এবং থেকে থেকে আপনার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় (অল্প সময়ের জন্য)।এর কারণ ক্ষণিকের জন্য আপনার শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায়।
  •  নিশ্বাস বন্ধ হলে আপনি হঠাৎ জেগে যান এবং আপনার হাতপা বা পুরো শরীর কেঁপে ওঠে।
  •  জেগে উঠেই আপনি ফের ঘুমিয়ে পড়েন।
  •  এটা রাতে অনেক বার হতে পারে। আপনার পরদিন ক্লান্ত লাগবে, কখনো কখনো মুখ শুকিয়ে যেতে পারে বা মাথা ধরতে পারে। দিনের বেলা হঠাৎ  হঠাৎ ভীষণ ঘুম পাবে।

এটি বেশি হয়

  •  বয়স্কদের
  •  যাঁদের ওজন বেশি 
  •  যাঁরা ধূমপান করেন
  •  যাঁরা অত্যধিক মদ্যপান করেন

 

কখনো কখনো রোগীর বদলে রোগীর বাড়ির লোকে আগে সমস্যাটা লক্ষ্য করেন। প্রাথমিক ভাবে চিকিৎসা শুরু হয় আপনার জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে। সিগারেট ও মদ খাওয়া কমান, ওজন কমান এবং শোয়ার পরিবর্তন করুন। আপনি বেশি অসুস্থ হলে আপনাকে হয়ত সিপাপ Continuous Positive Airway Pressure (CPAP) মাস্ক ব্যবহার করতে হতে পারে। এটি আপনার নাকের উপর এঁটে বসে এবং হাই প্রেসারে হাওয়া সাপ্লাই করে। এতে আপনার শ্বাসনালী বন্ধ হয় না।


ঘুমের অন্যান্য অসুবিধা

জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ২০ জনের মধ্যে ১ জনের নাইট টেরর হয় এবং শতকরা একজন ঘুমের মধ্যে হাঁটে। এদুটোই বেশি দেখা যায় শিশুদের মধ্যে।

ঘুমের মধ্যে হাঁটা

আপনি যদি ঘুমের মধ্যে হাঁটেন তবে আপনাকে দেখে লোকে ভাববে যে গভীর ঘুম ভেঙ্গে উঠে আপনি নানান কাজকর্ম করছেন। এমনকি হয়ত আপনি উঠে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করছেন। কখনো কখনো আপনি অস্বস্তিকর বা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও পড়তে পারেন। কেউ ঘুম ভাঙ্গিয়ে না দিলে পরদিন এই ঘটনা আপনার কিছুই মনে থাকবে না। কখনো কখনো নাইট টেরর (নীচে দেখুন)এর পরে লোকে ঘুমের মধ্যে হাঁটে।
যে ঘুমের মধ্যে হাঁটে, তাঁকে বিছানায় ফিরিয়ে আনতে হবে। সে এবং তাঁর চারপাশের কেউ যাতে আহত না হয় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। দরজা জানালা এবং যে কোনো ধারালো জিনিষ তালাচাবি দিয়ে রাখতে হয়।

 

নাইট টেরর

নাইট টেরর এমনিই হতে পারে অথবা এর সঙ্গে লোকে ঘুমের মধ্যে হাঁটতে পারে। নাইট টেররেও মনে হয় যে গভীর ঘুম থেকে মানুষ জেগে গেল। তারপর আধোঘুমে আধো জাগরণে তাঁরা থাকেন এবং খুব ভয় পান। সাধারণতঃ তাঁরা আর পুরোপুরি জাগেন না, ফের ঘুমিয়ে পড়েন। সে ফের ঘুমিয়ে পড়া অবধি বসে থাকা ছাড়া আপনার আর বিশেষ কিছু করার নেই। 
নাইট টেরর এবং দুঃস্বপ্ন এক জিনিষ নয়। নাইট টেররের কথা পরদিন আর কিছু মনে থাকে না।

 

দুঃস্বপ্ন

ভয়ের স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন আমরা সকলেই দেখে থেকে থাকি। বেশির ভাগ দুঃস্বপ্ন আমরা রাতের শেষভাগে দেখি, কারণ সেই সময়ে আমরা স্বপ্ন সবচেয়ে বেশি দেখি। খুব বেশি না দেখলে দুঃস্বপ্নের জন্য বিশেষ অসুবিধা হয় না। কোনো মানসিক আঘাত পেলে ঘন ঘন দুঃস্বপ্ন দেখা দেয়। প্রিয়জনের মৃত্যু বা কোনো দুর্ঘটনার পরে প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখে মানুষ। কাউন্সেলিং করলে অনেকে উপকার পান।

 

রেস্টলেস লেগস সিন্ড্রোম

  • আপনার সবসময় পা নড়বে (কখনো কখনো শরীরের অন্যান্য অংশও)
  • পায়ে ব্যথা বা জ্বলুনি হতে পারে
  • শুধু যখন রেস্ট নিচ্ছেন তখন এইসব অসুবিধা হয়
  • রাতে কষ্ট বাড়ে
  • হাঁটলে বা নড়াচড়া করলে কষ্ট কমে

আপনি হয়ত দিনের বেলা বসে ঠিকমত কাজ করতে পারবেন না, এবং রাতে ঠিকমত ঘুম হবে না। 
রোগীরা সাধারণতঃ মধ্যবয়সে চিকিৎসা করাতে আসেন, যদিও তাঁরা ছোটোবেলা থেকে এতে ভুগছেন। অসুখটি বংশগত, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এই অসুবিধা থাকতে পারে। এছাড়া প্রেগন্যান্সিতে,ডায়াবেটিস বা কিডনির অসুখে অথবা আয়রন বা ভিটামিনের অভাবে এই ওসুখ হতে পারে।
যদি অন্য কারণ না থাকে তবে রেস্টলেস লেগস সিন্ড্রোমের চিকিৎসা নির্ভর করে অসুখের তীব্রতার উপর। অল্প স্বল্প অসুবিধা হলে ভালো ঘুমানোর সহজ টিপস অনুযায়ী চললে সুরাহা হয়। বেশি তীব্র হলে ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। নানা ধরনের ওষুধের ব্যবহার আছে যথা অ্যান্টিপার্কিনসনিয়ান ওষুধ, অ্যান্টিএপিলেপ্টিক ওষুধ, ঘুমের ওষুধ বা ব্যথার ওষুধ। এতেও কাজ না হলে ঘুমের অসুখের কোনো স্পেসালিষ্টের কাছে হয়ত আপনাকে রেফার করা হতে পারে।


অটিজম 

এই অসুখে রাতে ঘুমোতে হয় এই বোধই থাকে না। সবাই যখন ঘুমোয় তখন এরা জেগে থাকে। এক্ষেত্রে স্পেসালিষ্টের কাছে যাওয়াই শ্রেয়।

Get in contact to receive further information regarding a career in psychiatry